
ডেস্ক রিপোর্ট I ঢাকা, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | Katha24.com
নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘটনা আর কখনো যেন না ঘটে—সে জন্য কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণের পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
এর আগে কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন এবং প্রতিবেদনভুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন তদন্ত কমিশনের প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন এবং ড. মো. আব্দুল আলীম। উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
২০১৪ থেকে ২০২৪: পরিকল্পিত নির্বাচন ডাকাতির চিত্র
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনের নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে তথাকথিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার কৌশল গ্রহণ করে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার গভীরতা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।
‘পুরো সিস্টেম দুমড়ে মুচড়ে ফেলা হয়েছিল’
প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো কাগজে রায় লিখে দেওয়া—এই বাস্তবতা জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন,
“দেশের মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জনগণ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছু করতে পারেনি। যারা জড়িত ছিল তাদের মুখ জাতির সামনে আনতে হবে। কারা করল, কীভাবে করল—সব জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি আর যেন কখনো না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করতেই হবে।”
২০১৮ সালে রাতের ভোট, ২০২৪ সালে ডামি প্রার্থী
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের আঁধারে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনের ভেতরে আওয়ামী লীগকে জেতাতে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা চলে, যার ফলে কিছু কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি প্রার্থী’ দিয়ে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।
প্রশাসনের হাতে চলে যায় নির্বাচন ব্যবস্থা
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘নির্বাচন সেল’, যা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে কার্যত প্রশাসনের হাতে চলে যায়। ফলে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
সুপারিশমালা প্রকাশের অপেক্ষা
তদন্ত কমিশন প্রতিবেদনের শেষে ভবিষ্যতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ সুপারিশমালা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।